জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধের আশঙ্কা, সাইবার হামলা ও নাশকতার ঝুঁকি বাড়তে থাকায় জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় নাগরিকদের আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। যুক্তরাজ্য থেকে অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স থেকে ভারত—বিভিন্ন দেশে সংকটের সময় অন্তত কয়েক দিন নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর জন্য খাবার, পানি, ওষুধ ও জরুরি সামগ্রী মজুত রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একসময় দুর্যোগের জন্য আগাম প্রস্তুতি নেওয়াকে অতিরিক্ত সতর্কতার অংশ হিসেবে দেখা হতো। তবে পরিস্থিতি বদলেছে। এখন বিভিন্ন দেশের সরকারও নাগরিকদের জরুরি প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে। কারণ, বড় ধরনের বিপর্যয়ে বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, মোবাইল নেটওয়ার্ক, ব্যাংকিং সেবা ও পণ্য সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে উদ্ধারকারী দল পৌঁছানো বা স্বাভাবিক সেবা চালু হওয়ার আগপর্যন্ত নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর সক্ষমতা থাকা জরুরি।
দেশভেদে প্রস্তুতির সময়সীমা ও সামগ্রীর তালিকায় পার্থক্য রয়েছে। কোনো দেশে তিন দিনের সরবরাহ প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও সাত থেকে ১৪ দিনের প্রয়োজনীয় সামগ্রী মজুত রাখার কথা বলা হয়েছে।
ফ্রান্স
ফ্রান্সে দুর্যোগের প্রথম ৭২ ঘণ্টাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ সময়ে সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ, টেলিভিশন ও রেডিওর মাধ্যমে তথ্য জানা এবং প্রয়োজনে দ্রুত নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার জন্য জরুরি ব্যাগ প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
জরুরি ব্যাগে খাবার, পানি, ওষুধ ও নগদ অর্থের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ নথির ফটোকপি, বাড়ি ও গাড়ির অতিরিক্ত চাবি এবং সময় কাটানোর জন্য খেলনা বা অন্যান্য সামগ্রী রাখতে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগের পরিকল্পনা তৈরি, গুজব ও অপতথ্য এড়িয়ে চলা এবং প্রয়োজনে স্বেচ্ছাসেবী বা নাগরিক সুরক্ষা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
জার্মানি
জার্মানিতে দীর্ঘদিন ধরেই জরুরি পরিস্থিতির জন্য খাবার মজুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আগে পরিবারগুলোকে ১৪ দিনের খাবার প্রস্তুত রাখার কথা বলা হতো। পরে এ সময়সীমা কমিয়ে ১০ দিন করা হয়। গত বছরের অক্টোবরে প্রকাশিত নির্দেশনায় সম্ভব হলে ১০ দিনের প্রয়োজনীয় সরবরাহ প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে অন্তত তিন দিনের খাবার ও জরুরি সামগ্রী থাকলেও তা সংকটের সময় সহায়ক হতে পারে।
দেশটির নাগরিক সুরক্ষা ও দুর্যোগ সহায়তা দপ্তর দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায়, এমন খাবার রাখার পরামর্শ দিয়েছে। রান্না ছাড়াই খাওয়া যায় এমন খাবারকে অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে। রান্নার প্রয়োজন হলে কম জ্বালানি লাগে—এমন খাবার বেছে নেওয়ার পরামর্শও রয়েছে, যাতে বিদ্যুৎ না থাকলে বিকল্প চুলার জ্বালানি দীর্ঘ সময় ব্যবহার করা যায়।
জরুরি সরঞ্জামের তালিকায় রয়েছে হাত দিয়ে ঘুরিয়ে চালানো বা সৌরশক্তিচালিত রেডিও, গুরুত্বপূর্ণ ফোন নম্বরের লিখিত তালিকা এবং পর্যাপ্ত ওষুধ।
যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্রে ২০০৩ সালে চালু হওয়া দুর্যোগ প্রস্তুতি কর্মসূচিতে আগাম পরিকল্পনা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। দুর্যোগের সময় পরিবারের সদস্যরা একই স্থানে নাও থাকতে পারেন। তাই কোথায় মিলিত হবেন, কীভাবে যোগাযোগ করবেন এবং জরুরি অবস্থায় কী পদক্ষেপ নেবেন—এসব বিষয়ে আগে থেকেই পরিকল্পনা তৈরির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পানীয় ও পরিচ্ছন্নতার প্রয়োজন মেটাতে প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য প্রতিদিন এক মার্কিন গ্যালন বা প্রায় ৩ দশমিক ৮ লিটার পানি রাখার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া জরুরি সংকেত দেওয়ার জন্য বাঁশি, ধুলা ও কিছু বায়ুবাহিত কণা থেকে সুরক্ষায় উপযুক্ত মাস্ক এবং অস্থায়ী আশ্রয় তৈরির জন্য প্লাস্টিকের শিট রাখার পরামর্শ রয়েছে।
কত দিনের খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী মজুত রাখতে হবে, তা অঞ্চলভেদে ভিন্ন। ক্যালিফোর্নিয়ায় কয়েক দিনের সরবরাহ প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হলেও হাওয়াইয়ে দুই সপ্তাহের বেশি সময়ের প্রস্তুতির কথা বলা হয়েছে। পরিবারের চাহিদা অনুযায়ী নিয়মিত জরুরি ব্যাগের সামগ্রী পর্যালোচনা এবং বাড়ি, কর্মস্থল ও গাড়িতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নর্ডিক দেশগুলো
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার হামলা শুরুর পর নর্ডিক দেশগুলো দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি আরও জোরদার করেছে। এসব দেশে যুদ্ধের পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হওয়া, মহামারি এবং চরম আবহাওয়ার মতো পরিস্থিতি বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
ফিনল্যান্ডে অন্তত তিন দিনের খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী মজুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বিকল্প বিদ্যুতের ব্যবস্থা ও পরিচ্ছন্নতার সামগ্রীও রয়েছে। তবে আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত পণ্য কিনে মজুত না করার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।
দেশটির কৌশলগত খাদ্যভান্ডারে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শস্য সংরক্ষিত রয়েছে। সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়লে বা অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যাহত হলে এই মজুত দিয়ে প্রায় নয় মাস জনগণের খাদ্যচাহিদা মেটানো সম্ভব বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সুইডেনে নাগরিকদের অন্তত এক সপ্তাহ নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর মতো প্রস্তুতি রাখতে বলা হয়েছে। দেশটির নির্দেশনায় ঘরে খাবার ও পানির ব্যবস্থা রাখা, ফ্রিজ নষ্ট হলে ব্যবহারের জন্য পানির বোতল জমিয়ে রাখা এবং টয়লেটে পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে বিকল্প স্যানিটেশন ব্যবস্থা তৈরির মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
নরওয়েতে অন্তত এক সপ্তাহের প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ইন্টারনেট, মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ব্যাংকিং লেনদেন বন্ধ হয়ে গেলেও যাতে মানুষ দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে পারে, সেটিই এ নির্দেশনার অন্যতম উদ্দেশ্য।
দেশটিতে ঘর গরম রাখার জন্য বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা বেশি। তাই গরম কাপড়, স্লিপিং ব্যাগ ও মোমবাতি মজুত রাখা এবং অগ্নিকুণ্ড ও চিমনি পরিষ্কার রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ডেনমার্কে তিন দিনের খাবারের একটি নমুনা তালিকাও দেওয়া হয়েছে। এতে রয়েছে ৫০০ গ্রাম ক্রিস্পব্রেড, টমেটো সসে ৩০০ গ্রাম টিনজাত ম্যাকারেল মাছ, ৩০০ গ্রাম ছোলা ও কিডনি বিন, ৫০০ গ্রাম করে পাস্তা ও শস্যজাতীয় খাবার, দেড় কেজি টিনজাত সবজি, ১০০ গ্রাম বাদাম এবং কিছু উদ্ভিজ্জ তেল।
অস্ট্রেলিয়া
অস্ট্রেলিয়ায় সাধারণত তিন থেকে সাত দিনের প্রয়োজনীয় সামগ্রী মজুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে নিউ সাউথ ওয়েলসের স্বাস্থ্য বিভাগ দুই সপ্তাহের প্রস্তুতি নেওয়ার কথা বলেছে।
পরিবারে শিশু, গর্ভবতী নারী, বয়স্ক ব্যক্তি বা অসুস্থ কেউ থাকলে তাঁদের বিশেষ চাহিদা অনুযায়ী খাবার, ওষুধ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
দাবানল মোকাবিলার প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও বিস্তারিত নির্দেশনা রয়েছে। বাড়ির আশপাশের ঝোপঝাড় ছেঁটে রাখা, জ্বলন্ত অঙ্গার থেকে মাথা সুরক্ষায় চওড়া কিনারার টুপি ব্যবহার এবং ধোঁয়ার ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে উপযুক্ত রেসপিরেটর মাস্ক পরার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিভিন্ন দেশের এসব নির্দেশনার মূল লক্ষ্য হলো—বড় ধরনের দুর্যোগে বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, ব্যাংকিং ও সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হলেও নাগরিকেরা যেন অন্তত কয়েক দিন নিজেদের মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে পারেন। আগাম পরিকল্পনা, জরুরি সামগ্রীর সঠিক সংরক্ষণ এবং নির্ভরযোগ্য সরকারি নির্দেশনা অনুসরণকে তাই দুর্যোগ মোকাবিলার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক